Friday, 2 July 2021
পাহাড় আমারে ডাকে
(A short story after long.)
"পাহাড় আমারে ডাকে"
আজকাল ছেলেমেয়েদের মুখে একটা প্রবাদ খুব শুনি, 'মাউন্টেন্স আর কলিং', বলতে 'পাহাড় আমারে ডাকে'। তা কখনো কি ভেবে দেখেছেন পাহাড় কি সত্যি ডাকে, না আরো পাঁচটা খামখেয়ালিপনার মতো এও আরেক?
তবে এই প্রবাদ প্রথমবার শুনেছিলাম আমার বড়োজেঠার মুখে খুব ছোটবেলায়। কিন্তু আরেকটা প্রবাদ ও আছে, নিশ্চয় শুনেছেন, 'When there is great love, there are miracles'. তা সেই প্রেম পাহাড়ের প্রতি ই হোক না কেন।
আমার নাম গিরিরাজ সেন। বয়স ৭২। যেই গল্প... না গল্প না, যেই স্মৃতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে চলেছি এতে ভয়ের চেয়ে অনেক বেশি আবেগ। এও আজকালকার সময়ে কম ভয়ের নয় তাইনা?
যা হোক, যা বলছিলাম..
আমার জেঠা স্বর্গীয় অম্বিকানাথ সেন ছিলেন একজন পুরাতত্ত্বজ্ঞবিধ। যখন তিনি প্রেসিডেন্সি থেকে 'ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি' তে এম.এ. করেন, তখনো ভারত পরাধীন। 'বৌদ্ধ ধর্মের অবশিষ্টাংশ' নিয়ে থিসিস লিখার সময় উনাকে অনেক গম্পায় থাকতে হয়ে। আর তাবো গম্পায় গোটা ছয় মাস কাটাতে কাটাতে কখন যে তাকে ঘেরা পাহাড়গুলোর প্রেমে পরেন তিনি নিজেও বুঝতে পারেননা। তারপর যখন কাশ্মীর এ নামকরা পুরাতত্তবিধ ডি টেরা'র সাথে কাজ করার ডাক পরে, তার এই প্রেম তাকে আরো জাঁকিয়ে বসে। ছুটিতে বাড়ি ফিরলেও শুনতাম তিনি নাকি পাহাড়ে ফেরার জন্য হাসফাস করতেন আর কলকাতার বিদায় নিয়ে বাঁচতেন। কিন্তু তারপর একটু বয়েস হওয়ার পর তাকে নাসিক এর নাভদাতোলি নামক এক জায়গায় চলে যেতে হয়ে কাজের সুবাদে। সেখানে 'মহেস্বর' নামে এক জায়গায় খোদাই করার সময় আমাদের কিছু পুরাতন সংস্কৃতির উৎসের খোঁজ পাওয়া যায়। নিজের কাজটাকে ভালোবাসলেও তার পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা যেন বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। সময়ের সাথে শরীরে বয়েসের প্রকোপ হওয়ায় বাড়ি ফিরে এলেও কদিন পরপর তাকে যেন পাহাড় টেনে নিতো নিজের কাছে। যাওয়ার সময় বলতেন 'পাহাড় আমারে ডাকে'।
তার সেই দূর পাহাড়ের গল্পগুলো অবাক চোখে মুগ্ধ হয়ে শোনা আমার ছোটবেলার রঙিন মুহূর্ত। সেই দেওদার, পাইন আর বরফে ঢাকা মাইলের পর মাইল পৃথিবী। আকাশ আর মাটির মধ্যে যেন শুধু পাহাড় দাঁড়িয়ে। তা না হলে সব গুলিয়ে একাকার!
জেঠুর নাকি সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি ছিলো বরফের ওপরে হাঁটা। পায়ের নিচে যেন লক্ষ লক্ষ জোয়াহরাত ঝিলিক মারছে, আর তার জুতোর নিছে সেই চরচর আওয়াজ যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে তিনি সেই পাহাড়ের কাছে কতটা আল্হাদের। ঘরে ফিরে যখন জুতোটা খুলে রাখতেন, আস্তে আস্তে সেই মানিক গলে তার জুতোর চারিদিকে পরে থাকতো। যেন বলতো,
"জীবন নস্যর হলেও অনুভূতি অমর"।
জেঠুর জীবনে ঐ এক পিছুটান ছিলো। তাই আরেকটু বয়েস হওয়ার পর যখন বাতের ব্যথা আর স্বাসকষ্ট তার শরীরটাকে বেঁধে ফেলে, তার মনটা যেন বারবার সেই হিমেল হাওয়া আর তুষার মুকুটের তেষ্টায় পাগল হয়ে যেতো। শুধু বলতেন,
'আর একটিবার যদি কোনো বরফঢাকা পথে চলতে পারতাম তাহলে সব বেমো দূর হয়ে যেতো'।
কিন্তু আস্থমা থাকায় ডাক্তারবাবু স্পষ্ট না করে দিলেন এবং বাড়ির সবাইকে বলে দিলেন কিছু হলে তার জন্য যেন উনাকে দায় না দেওয়া হয়।
আমার বাবা জেঠুর ঘরে একটি বিশাল বড়ো ছবিও লাগিয়ে দিলেন কাঞ্চনজঙ্গার। যদি তাতেও দুধের স্বাদ একটু ঘোলে মেটে।
..নীল আকাশের সিংহাসনে হাত পা ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে বসে থাকা তুষাররঞ্জিত কাঞ্চনজঙ্গা আর তার মাথায় রোদে ঝলেমল করতে থাকা লাল স্বর্ণমুকুট! নামটা ভেবেই রেখেছিলো কেউ।
তবে জেঠু তার দিকে তাকিয়ে যেন আরো কষ্ট পেতেন। তার চাইতে তিনি মুখ ঘুরিয়ে ভ্রমণকাহিনি বা কোনো পুরাতনের খোঁজের বেপারে পড়তে বেশি ভালোবাসতেন। নিঃশাস নিতে যখন কষ্ট হত তখন বৌদ্ধধর্মের কিছু গান চালিয়ে দিতেন গ্রামাফোনে আর চোখ বুঝে ফিরে যেতেন নিজের ভালোবাসার পাহাড়ে।
একদিন সকালে উঠে শুনলাম জেঠুকে পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে না বলে একটা বিতিকিচ্ছিরি করার লোক উনি নন। আর বলে গেছিলেন আমাকেই।
আমি তখন সদ্য স্কুলে ঢুকেছি। আগের রাতে বলেছিলেন, 'গিরি আমি পাহাড়ে যাচ্ছি'।
আমি বললাম, 'তোমাকে তো ডাক্তার মানা করেছে জেঠু'।
জেঠু বলেছিলো, 'পাহাড় আমারে ডাকে রে গিরি। বলে দিস শিগগির ফিরবো। কাউকে বলিসনা এখন। এরা বুঝবেনা, তুই তো বুঝিস তাই বললাম।'
ছোটবেলায় কি বুঝেছিলাম জানিনা তবে স্কুলে সারাদিন বন্দি থেকে মনেহতো ছাড় পেলে তো আমিও পালাতাম! তা জেঠু যদি একটু পালাতে চায় তো ক্ষতি কি? সে তো আর আমার মতো স্কুলে পরেনা। এতো কষ্ট তার কি দরকার?
কিন্তু চলে যাওয়ার পর একমাস কোনো খবর পাওয়া গেলনা জেঠুর। বাবা পুলিশ থেকে খবর কাগজ, বন্ধু বান্ধব, পুরোনো কলীগ থেকে অফিসার কিছুই বাদ রাখেননি খোঁজ নিতে। তখন তো আর গুগল ছিলোনা। কিন্তু জেঠু যেন ধরা দিতেই চাননি। একটু ভয় পেয়েছিলাম, তবে যখন রেলওয়েতে কাজ করা বাবার এক বন্ধু থেকে জানা গেলো তিনি দার্জিলিং এর টিকিট কেটেছিলেন তখন মনে হয়েছিলো, ইশ জেঠুর সাথে বেরিয়ে গেলেই ভালো হতো।
কিন্তু তার দিন পনেরো পর একটা ফোন আসে, শুনেছিলাম জেঠু নাকি তার কোনো নেপালি বন্ধুর সাথে কাঞ্চনজঙ্গায় পারি দিয়েছিলেন। কোনো বেমালুম বরফে ঢাকা গ্রামে তার মৃত্য হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা না, বেশ ভালোই ছিলেন। রোজ হাঁটতে বেরতেন, পাহাড় দেখে দেখে বই পড়তেন, চা খেতেন, গল্প করতেন। তবে ৫-৬ দিন থেকে চুপচাপ জানালার ধারে বসে বা শুয়ে থাকতেন। কিন্তু মুখে কোনো কষ্ট বা দুঃখের চিহ্নও ছিলোনা।
তার দেহ বাড়ি আনা হয়নি, বরং আমরাই গেছিলাম দার্জিলিং গাড়ি ভাড়া করে। আমার মামার বাড়িতেই জেঠুকে আনা হয়েছিল অ্যাম্বুলেন্সে। কিছু মনে করবেননা কিন্তু আমার চোখে ঐদিন তাকে শেষবার দেখে মনে হয়েছিল দশ পনেরো বছর বয়েস যেন কমে গেছে জেঠুর। পরনে ধুতি নয়, সেই আগের কর্ড ট্রাউসার আর ওভারকোট। তার সেই বুট জুতো যা পরে পাহাড়ে ঘুরতেন, সেটা আমি বাক্সে করে নিয়ে এসেছিলাম।
কিন্তু তারপর যা অনুভব করলাম সেটা আমার জীবনের অভিগ্যতা না একটা বড়ো পাওয়া, তা আপনারাই বুঝুন।
জেঠুর জুতোটা জানিনা কেন পালিশ করে তার ঘরের এককোনে রাখবো ভাবলাম। খুব দামি পিওর লেদার এর বিদেশি বুট। তিনি সেটা পরে না জানি কতবার পারি দিয়েছিলেন তার প্রেমের পর্বতগুলোতে। হয়তো আমাকেও সেই জুতো একদিন নিয়ে যাবে অনেক নতুন দেশে, নতুন অভিগ্যতায়। সেই কিশোর মনের আবেগেই হয়তো জুতোটা আমার কাছে খুব অমূল্য ছিলো।
একদিন খুব স্নেহের সাথে জুতো পালিশ করে বারান্দায় রেখে তার পাশেই বাগানের সিঁড়িতে বসে মনে মনে হিসেব করছি কবে এই উদ্ভট স্কুল এর পালা চুকিয়ে আমিও জেঠুর মতো পাহাড়ে যাবো, এমন সময় মনে হলো হাফ প্যান্টের পাশটা যেন ভিজে গেছে। তাকিয়ে দেখি এক অদ্ভুত বেপার! সেই চকচক করে মাত্র মুছে রাখা জেঠুর জুতোর চারিদিকে জমে আছে জল! যেন রোদের তাপে বরফ গলে একটি ছোট ডোবা তৈরী হয়েছে আমাদের শুকনো বারান্দায়।
ছোটবেলার সবথেকে বড়ো গুন কি জানেন? তখন ভয়ের চেয়ে কৌতূহল বেশি থাকে। সেই কৌতূহল সহকারে জুতোর কাছে মাথা নিয়ে ভালো করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছি ব্যাপারটা এমন সময় কানে জেঠুর ফিসফিস গলা স্পষ্ট শুনতে পেলাম..
"গিরি... জীবন নস্যর হলেও অনুভূতি অমর', ভুলে যাসনা যেন!!"
________________________________________
আমি গিরিরাজ সেন, বয়েস ৭২। বিবাহিত।
পেশায় চাকুরে, উদ্দেগে পর্বতারোহী।
ভারতের পুরোটাই আজ আমার দেখা। তা বাদে দেশ বিদেশের অসংখ্য পাহাড়, সমুদ্র, শহর, মরু, নদী, জলপ্রপাত, অট্টালিকা, কেল্লা, মন্দির, মসজিদ, গিরিজা ইত্যাদি।
জীবন: ১
আখ্যাপ: ০
আজও সেই জুতো আমার অনুভূতিকে চলমান করে রেখেছে।
আপনিও রাখবেন কিন্তু!
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment